পাশ নম্বর
সাত বছরের মাহিনকে আম্মু বলেছিল সৃষ্টিকর্তা আমাদের দুঃখ কষ্ট দেয় পরীক্ষা হিসেবে, পাশ করলে অনেক ভালো ভালো উপহার পাবো আমরা। তখন মাত্র মাহিন পরীক্ষা কি বুঝতে শিখেছে, স্কুলে নিয়মিত যাওয়া আসা করছে। বছর খানেক পরে সেই ছোট্ট মাহিন ক্যান্সার আক্রান্ত মায়ের বিছানার পাশে দাড়িয়ে হাতজোড় করে সৃষ্টিকর্তাকে বলছে, “হে আল্লাহ, দয়া করে এই পরীক্ষাটি আমার জন্য আরো কঠিন করো না, আমি হয়ত আর কখনোই পাশ করতে পারবো না। আমার আম্মুকে নিয়ে যাইও না প্লিজ।”
মাহিন আর কখনোই পাশ করতে পারে নি, পরবর্তী পনের বছরে তার জীবন ও চারপাশের মানুষ তাকে একটির পর একটি এমন পরীক্ষার মাঝে ফেলেছিল যেখানে পাশ করা দূরের বিষয়, টিকে থাকাই অলৌকিক ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হবে পাঠকমহলে। সে এখনো পরীক্ষা দিয়ে যাচ্ছে কিন্তু পাশ নম্বর মিলছে না। কি করলে মিলবে এই পাশ নম্বর?
প্রশ্নটি নিজের উদ্দেশ্যে নাকি সৃষ্টিকর্তার উদ্দেশ্যে ঠিক বোঝা গেলো না, চোখ বন্ধ করে ভাবছে মাহিন। মুহূর্তেই ভেসে উঠলো শেষ সময়ের মায়ের মলিন মুখ, বাবার অবহেলা, আত্মীয়দের বঞ্চনা, সঙ্গীর প্রতারণা, শিক্ষকের বিকৃত যৌনতা, কাছের মানুষদের মানসিক নির্যাতন, তার সাথে হওয়া প্রতিটা অন্যায় ও দুর্ঘটনা! সবগুলো যেন হাজার ভোল্টের হ্যাজাক বাতির ন্যায় চোখের সামনে পীড়া দিতে হাজির হলো, কিন্তু পরমুহূর্তেই ভেসে উঠলো একটি গাছ। তার মায়ের কবরের পাশে কেউ একজন লাগিয়েছিল, কয়েক বছরের মধ্যেই গাছটিতে ফুল আসতে শুরু করে, সাদা শুভ্র এক ধরনের ফুল। যখনি তার মন খারাপ হতো তখন গাছটির নিচে গিয়ে বসতো ছোট্ট মাহিন। ফুলগুলো হাতে নিয়ে আনমনে খেলতো সে আর মায়ের কাছে গল্পচ্ছলে বলতো তার রাজ্যের জমানো কথা। তারপর একদিন সেখানেও বিচ্ছেদ হলো, সব ফেলে চলে আসলো ঢাকায়। আর কখনো দেখা হয়নি মায়ের কবর, কিংবা নাম না জানা ফুল গাছটি। জীবনের নিয়মে ঘাত প্রতিঘাত পার হয়ে দিনাতিপাত করছে সে।
এত বছরে কেউ তার সাথে আদর করে কথা বলে নি, কেউ তাকে দেয়নি অকৃত্রিম ভালোবাসার স্বাদ। যখন কোন বন্ধু – বান্ধবী কিংবা তাদের মা বাবা কেউ স্নেহমিশ্রিত কণ্ঠে মাহিনকে ডাকতো তাতেই সে কখনো কৃতজ্ঞতায় কখনোবা আনন্দে বিগলিত হয়ে যেতো। কিন্তু কোনটাই স্থায়ী হতো না সম্পর্কের নানা টানাপোড়েনের কারণে। একসময় সে ধরেই নিয়েছে জীবনটা এইভাবেই পার হয়ে যাবে, ক্লাস এসাইনমেন্ট, এক্সাম, কিংবা পার্ট টাইম চাকরিতে অমানসিক পরিশ্রমের জাতাকলে। জীবনে টিকে থাকার সংগ্রামে ভুলে গিয়েছে মানুষকে ভালোবাসা যায়, বিশ্বাস করা যায়। এমনকি ভুলে গিয়েছে কিছুটা শান্তি তারও প্রাপ্য। আর সেটা মনে করিয়ে দিতেই হুট করে একদিন তার আগমন ঘটে, যাকে মাহিন আগে কখনো সেভাবে লক্ষ্য করে নি। কিন্তু সে ঠিকই লক্ষ্য করছিল মাহিনকে, মুগ্ধ হয়েছিল মাহিনের অস্ত্বিতে। দিনে দিনে বাড়তে থাকে বন্ধুত্ব, ঘন ঘন দেখা সাক্ষাতে গভীর হতে থাকে অনুভূতি। যে অনুভূতির সাথে একদমই পরিচিত নয় মাহিন, বরং কোন এক অজানা আশঙ্কা কাজ করে তার মাঝে। একদিন মাহিনের হাতের তালুতে কিছু একটা গুঁজে দিয়ে চলে যায় সে। হাত খুলে দেখে সেই ফুল, নাম না জানা সাদা শুভ্র ফুল, যে ফুলের সাথে তার কেটেছে কৈশোরের প্রথমাংশ। যে কৈশোর ভুলে যেতে চায় মনে প্রাণে তবুও বারবার ফিরে আসে তার জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে।
ধবধবে সাদা ফুলগুলোর মাঝেই ছোট্ট একটি চিরকুট যাতে লিখা, “মাহিন, আমার জীবনের পরীক্ষায় পাশ নম্বর তুমি! ভালোবাসি!”
—
ফয়সাল আহমেদ রাফি
ফেব্রুয়ারি ১৪, ২০২৩
মোহাম্মদপুর, ঢাকা




