রাপদ আশ্রয়: যেখানে ভুল স্বীকার করা যায়, সেখানেই গড়ে উঠে আত্মিক সম্পর্ক
একটি বাচ্চা ছেলে ৪-৫ বছর বয়স হবে, সে ভুলবশত তার হাতে থাকা জুসের প্যাকটা জোরে চাপ দিয়েছে, এতে প্যাকেটে থাকা জুস উপচে কিছু ফ্লোরে পড়েছে এবং কিছু তার মায়ের জামায়। প্রথমে তার মা খেয়াল করে নি তবুও ছেলেটার চোখে মুখে ভয় ও অনুশোচনার ছাপ, তার হাতে থাকা একটা পুরাতন টিস্যু দিয়ে ফ্লোর মুছতে বসে পড়লো তখন তার মা ঘুরে তাকিয়ে দেখলো। কিছু বুঝে উঠার আগেই উনি ছেলেকে একটা থাপ্পর মেরে বসলেন, এবং দাঁত কিড়মিড় করে তাকিয়ে রইলেন। পুরো ঘটনাটা খুব দ্রুত ঘটে গেলো, ছেলেটার চোখে পানি চলে আসলো কিন্তু আশ্চর্য হয়ে খেয়াল করলাম সে শব্দ করে কান্না করছে না। বরং নিশ্চুপ এক গ্লানি যেন চোখ বেয়ে পড়ছে, অপরাধবোধ, অপমানবোধ এবং মায়ের দুর্ব্যবহারে যে কষ্ট সে পাচ্ছে সেটা চোখেমুখে স্পষ্ট। আমি নিশ্চিত অনেক মানুষের সামনে অপমানিত হওয়ার যে লজ্জা সেটা সে বহুকাল বয়ে বেড়াবে নিজের অজান্তেই। অথচ তার প্রতি একটু সহমর্মী হলে হয়তো সে নিজেই ভুল স্বীকার করতো কিংবা সরি বলতো, যেমনটা আমাদের বাসায় অয়ন্তী বলে থাকে যখন সে কোন ভুল করে।
কোন এক অদ্ভুত কারণে আমার অন্যতম ভালো লাগার মুহূর্ত হলো কেউ যখন নিজের ভুল স্বীকার করে। অর্থাৎ সেই মানুষটা নিজে নিজে অনুধাবন করেছে তার কাজ বা কথাটা অন্যায় বা ভুল ছিল, তারপর সেটা নির্দ্ধিধায় ব্যক্ত করেছে। এইটা করতে যে পরিমাণ মানসিক শক্তি প্রয়োজন সেটা অকল্পনীয়।
এই পুরো প্রক্রিয়ায় আরেকজন মানুষের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে, যার কাছে ভুল স্বীকার করা যায় সেই মানুষটা। অর্থাৎ তার কাছে নিজেকে মেলে ধরা যায়, নিজের ভুল ত্রুটি স্বীকার করে কিভাবে পরিবর্তন নিয়ে আসবো সেটা নিয়ে আলোচনা করা যায়, অর্থাৎ প্রচন্ড আস্থা ও বিশ্বাসের জায়গাটা সেই ব্যক্তি ইতোমধ্যে নিয়ে নিয়েছে বলেই তার কাছে নিজের ভুল স্বীকার করা যায়।
কাউকে পিটিয়ে, ব্লাকমেইল করে, ভয় দেখিয়ে কিংবা ম্যানিপুলেট করে ভুল বা অন্যায় স্বীকার করানোর মাঝে আসলে কোন পরিবর্তন থাকে না, উল্টো আরো অন্যায় করার মানসিকতা বা প্রতিশোধ পরায়ণতা তীব্রতর হয়। অন্যদিকে একটা মানুষ যখন বুঝতে পারে তার ভুল হয়েছে বা অন্যায় হয়েছে, এবং সে যখন কাছের মানুষের কাছে সেটা স্বীকার করে তার অর্থ হচ্ছে সে নিজে যেমন পরিবর্তন করার মানসিকতা ধারণ করে তেমনি সেই কাছের মানুষটা কে সে অত্যন্ত বিশ্বাস করে, আস্থা রাখে এবং তার কাছে নিজেকে মেলে ধরতে পারে। এই নিরাপদ আশ্রয়টা যদি ছোট বেলা থেকে তৈরি হয় তবে পারিবারিক, সামাজিক ও ব্যক্তিগত সম্পর্কগুলো আরো সুন্দর ও অর্থপূর্ণ হয়ে উঠে।
তাই বাবা মা ভাই বোন কিংবা প্রিয় মানুষদের বলবো, আপনারা নিজ নিজ সন্তান, ভাইবোন কিংবা সঙ্গীর জন্য নিরাপদ আশ্রয় হয়ে উঠুন, ভুল বা অন্যায় করতে পারে, কিন্তু সেটা স্বীকার করার ক্ষেত্র তৈরি করুন। আর মেনে নিতে চেষ্টা করুন, ভিন্নতা থাকবেই, হোক সেটা ব্যক্তিত্বে, আচরণে এবং চিন্তায়, ভিন্নতা মানেই ভুল বা অন্যায় নয়। এইটা পারিবারিক ও সামাজিক চর্চায় নিয়ে আসুন, তাহলে আমরা হবো সহনশীল, তেমনি আমরা বুঝতে পারবো কোথায় ভুল বা অন্যায় করেছি, ফলে দ্রুত পরিবর্তন নিয়ে আসতে পারি। বিশেষ করে কৈশোরকালীন সময়ে বাচ্চাদের আত্মসম্মানবোধ প্রবল থাকে, তাই তাদেরকে অপমান বা নির্যাতন না করে বরং তাদের ভুলগুলো শুধরে নিতে সাহায্য করুন। অধিকাংশ সময় ওরা নিজেরাই বুঝতে পারে কোনটা ভুল বা অন্যায়, তখন নিজেরাই শুধরে নেওয়ার চেষ্টা করে, অনেক সময় ওদের জন্য বিষয়টা বেশ কঠিন হয়ে পড়ে কিন্তু বড়দের সহযোগিতা ও সহমর্মিতা পেলে সহজেই নিজেদের ভুল স্বীকার করে এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এর জন্য প্রয়োজন উৎসাহ ও নিরাপদ আশ্রয়ের নিশ্চয়তা যা পরিবারের সদস্যগণ দিতে পারেন।
তবে অনেকেই মনে করেন যারা চুরি ছিনতাই, খুন, ইত্যাদি অপকর্মের সাথে জড়িত তারা তো ভুল স্বীকার করে না বা অন্যায় মনে করে না, ওদের মাঝে তো কোন অনুশোচনা বোধ নেই, এমনকি শাস্তি পাওয়ার পরেও এদের মাঝে কোন পরিবর্তন নেই, তাহলে এদের জন্য কিভাবে নিরাপদ আশ্রয় তৈরি করবো? লক্ষ্য করার বিষয় হলো এরা দিনে দিনে পারিবারিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভাবে বঞ্চিত হতে হতে এমন পর্যায়ে গিয়েছে যে অন্যায় বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ব্যতীত তারা আর কোন কিছু চিন্তা করতে পারে না, এদের জন্য রাষ্ট্রীয় আইন ও বিচার রয়েছে। এইখানে আসলে সাময়িক নিরাপদ আশ্রয় খুব একটা কাজ নাও করতে পারে, তারপরেও আমি মনে করি প্রতিটা মানুষের প্রতি সহমর্মী হওয়া এবং তাদের প্রতি দায়িত্ব আমাদের পালন করা জরুরি। তার অন্যায়ের ধরন অনুযায়ী রাষ্ট্র তার বিচার করবে, কিন্তু এইটাও সত্য আমরা এখন এক রাষ্ট্রের অংশ যেখানে বিচার ও আইন সবার জন্য সমান না, এমনকি আমাদের মত সাধারণ মানুষকে রক্ষায় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েও দায়িত্ব পালন করতে পারছে না, সেক্ষেত্রে আমরা বাধ্য হয়ে নিজেরাই আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছি। তারপরেও আমি বলবো এইটা সাময়িক, আশা করি অচিরেই শান্তি ও নিরাপত্তা ফিরবে জনমানুষের জীবনে।
আমার আলোচনার মূল প্রসঙ্গ হলো একটা বাচ্চা থেকে শুরু করে প্রাপ্ত বয়স্ক কেউ কিংবা আপনার সঙ্গী, তারা যখন ভুল বা অন্যায় স্বীকার করে তখন তার প্রতি আক্রমনাত্মক না হয়ে তাকে বোঝার চেষ্টা করুন, সহমর্মী আচরণ করুন তার প্রতি এবং একই সাথে তাকে সঠিক কাজ বা চিন্তাগুলো করতে উৎসাহিত করুন। এর ফলে তারা অল্পতেই যেমন আপনার কাছে নিজেকে মেলে ধরবে, তেমনি ভবিষ্যতে বড় ধরনের ভুল বা অন্যায় ঘটার সম্ভাবনা বহুলাংশে কমে আসবে, যা মূলত পারিবারিক, সামাজিক ও ব্যক্তিগত সম্পর্কে নিরাপত্তা বৃদ্ধি করবে এবং অনুভূতির দিক থেকে প্রতিটি সদস্যের নিজেকে পরিপূর্ণ লাগবে।
– – – – –
যেকোন তীব্র অনুভূতি কিংবা বিপর্যস্ত মানসিক অবস্থায় নিজের কথাগুলো শেয়ার করতে কল করতে পারেন আমাদের হেল্পলাইনে, প্রতিদিন বিকেল ৪টা থেকে রাত ২টা পর্যন্ত চালু রয়েছে দ্যা পার্পললাইন 09647 625 217.
– – – – –




